যেসব পানি আমরা প্রতিদিন খাচ্ছি তা কি বিশুদ্ধ? বাসায় পানি ফুটিয়ে বা ফিল্টার করা পানি হয়তো কিছুটা বিশুদ্ধ। কিন্তু হোটেলে, রাস্তাঘাটে ফিল্টার করা পানির নামে নীল জারের যেসব পানি আমরা প্রতিনিয়ত পান করি তা কতটুকু দূষণমুক্ত? যেসব হোটেলে আমরা খাবার খাই সেসব হোটেল কি ফিল্টার প্ল্যান্ট বসিয়েছে? এসবের নজরদারি কি ঠিকমত হয়? খুব সহজেই বলা যায়, নজরদারি ঠিকমত হয় না। তাছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে ফিল্টার পানি সরবরাহ করছে এদের মধ্যে খুব অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানই বিএসটিআইয়ের অনুমোদন পাওয়া। অধিকাংশই অবৈধ।

দূষিত পানি পান করার ফলে সম্প্রতি ভয়াবহ হারে বেড়ে গেছে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। হেপাটাইটিস, টাইফয়েড, ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, জন্ডিসের মতো মারাত্মক ব্যাধির উত্স দূষিত পানি। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের অভিমত, এ রকম দূষিত পানি দীর্ঘদিন পান করতে থাকলে আরো জটিল রোগ, এমনকি মরণব্যাধি ক্যান্সারও হতে পারে। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা দিতে না পারলে জনস্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণভাবে হুমকিমুক্ত করা যাবে না। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা বিধান করে বহুরোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

রাজধানী ঢাকায় দৈনিক পানির দরকার হয় ২২০ থেকে ২৩০ কোটি লিটার। ঢাকার পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে দিনের চাহিদার পুরোটাই সরবরাহও করে। তবে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ওয়াসার পানিতে মাত্রাতিরিক্ত দুর্গন্ধ ও ময়লা থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে ফোটানো হলেও কিছু এলাকায় সরবরাহকৃত পানি থেকে দুর্গন্ধ যাচ্ছে না, তা পানযোগ্যও করা যাচ্ছে না। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহকৃত পানির ১৫ শতাংশ আসে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার থেকে। শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা থেকে পানি এনে শোধন করে তা নগরবাসীর জন্য সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এ দুই নদীর পানি এতটাই দূষিত যে তা শোধন করেও পানযোগ্য করা যাচ্ছে না।

কোম্পানিগুলোর অসাধুতা: ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যে পানি সরবরাহ করে, তা সরাসরি পান করা তো চরম ঝুঁকিপূর্ণ, এমনকি ফুটিয়ে, ফিল্টার করেও গন্ধমুক্ত পানের উপযোগী করা যায় না। আর বিশুদ্ধ খাবার পানির এই সংকটের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যক্তিরা রমরমা বাণিজ্য করছে। বিশুদ্ধ পানির নামে বোতলজাত পানি অথবা জেরি-ক্যানে বিক্রির ব্যবসা এখন রমরমা। কিন্তু রাজধানীসহ সারা দেশে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকিরা জেরি-ক্যানে করে যে পানি বিক্রি করে তার বেশিরভাগই বিশুদ্ধ নয়। পানি বিশুদ্ধ কি না তা না জেনেই মানুষ এসব পানি কিনছেন।

জানা গেছে, পানি সরবরাহকারী ঢাকার অনেক প্রতিষ্ঠানেরই বিএসটিআই’র লাইসেন্স নেই। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সরবরাহ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া যাদের লাইসেন্স রয়েছে তাদের অনেকেও পানির গুণগত মান ঠিক রাখছে না।

বিএসটিআই যা বলছে:বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) সূত্রে জানা গেছে, পানিতে ক্ষারের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৬ দশমিক ৪ থেকে ৭ দশমিক ৪। কিন্তু মোবাইল কোর্টের পরীক্ষায় ঢাকায় সরবরাহকৃত বেশিরভাগ জারের পানিতে ক্ষারের পরিমাণ বেশি পাওয়া গেছে। তাছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই পরিশোধন না করে ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই প্লাস্টিকের জারে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। শুধু জারের মুখ কর্কবন্দী করে নাম দেয়া হয়েছে ‘ফিল্টার পানি’। বিশুদ্ধ দাবি করে সেই পানি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও অফিস-আদালতে। তথাকথিত বিশুদ্ধ পানিভর্তি জারটির গায়ে নেই কোনো লেবেল, এমনকি উত্পাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও থাকে না।

বিএসটিআই মহাপরিচালক মোঃ সাইফুল হাসিব জানান, সারাদেশে আড়াইশ’ বৈধ পানির প্ল্যান্ট রয়েছে। তাছাড়া বিএসটিআই-এর অনুমোদন নিতে আসা ১০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তিনি দাবি করেন, বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সাথে নিয়ে নিয়মিত এসব অবৈধ কারখানা বন্ধে অভিযান পরিচালনা করে চলেছে। তবে দেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য অবৈধ পানির প্ল্যান্ট তাদের নজরের বাইরে থেকে যায়। এসব প্ল্যান্ট বন্ধের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিএসটিআই ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কতগুলো নিয়ম মেনে জারে পানিভর্তি করে বিক্রি করতে হয়। সে জন্য প্রথমত বিএসটিআই’র অনুমোদন থাকতে হবে। একজন রসায়নবিদ ও পরিচ্ছন্ন কর্মী থাকতে হবে। যেসব কর্মী জারে পানি ভর্তি করবেন, তাদের সুস্বাস্থ্যের সনদ থাকতে হবে। লেবেলে উত্পাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকেই এসব নিয়ম মানতে দেখা যায় না।

Leave a Reply

  • (not be published)