গণপরিবহনের দুর্ভোগ লাঘবে রাইড শেয়ারিং সেবা চালু হলেও এতদিনেও যাত্রীবান্ধব হতে পারেনি এসব সেবা। দিন যতো যাচ্ছে সেবার মান ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ততো বাড়ছে। এছাড়া সেবাটি চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় যাত্রী-চালকের অনেকে নিহত ও পঙ্গুত্বের শিকার হলেও যথাযথ ক্ষতিপূরণ মেলেনি কারো। একদিকে অভিযোগের নিষ্পত্তি না করা অন্যদিকে সরকারকে আয়কর প্রদান ছাড়া লাগামহীন ব্যবসা করায় নগরবাসীর মতো ব্যবসায়ীদের মধ্যেও রয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া।

 

 

এদিকে, হঠাৎ করে নীতিমালার কয়েকটি শর্ত শিথিল করে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যাত্রী ও সড়ক বিষেশজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, এমনিতেই রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের তোয়াক্কা না করে যাচ্ছেতাইভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে শর্তের শিথিলতা তাদেরকে আরও বেপরোয়া ও লাগামহীন করে তুলবে।

সেবা গ্রহনকারী বেশিরভাগ যাত্রীদের অভিযোগের মধ্যে- অ্যাপসের অস্বাভাবিকতা, সহজ রুটের বাইরে ভিন্ন রুটের ব্যবহার, অ্যাপসে দুরত্ব ও গন্তব্যের মারাত্মক অংসগতি, অফারকালে অতিরিক্ত টাকা কাটা, গন্তব্য পছন্দ না হলে যেতে অনীহা, নির্দিষ্ট ভাড়ার অতিরিক্ত দাবি, যাত্রীদের সাথে দুর্বব্যবহার, মাদকাসক্ত বাইকার, অনুন্নত গাড়ি ও মোটরসাইকেল, অ্যাপস কাজ না করার অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা কাটার অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে লার্নিং কাগজ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়া, পরিষ্কার না করে একটি হেলমেটের লাগামহীন ব্যবহার, অনিরাপদ খেলনা হেলমেট ব্যবহার, অ্যাপসের নম্বরের সাথে বাইকের নম্বর প্লেটের মিল না থাকা এবং কাগজপত্র ছাড়াই একজনের নামে নেওয়া বাইক অন্যের চালনার অভিযোগ নতুন করে যুক্ত হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা বলেন, রাইড শেয়ারিং সংশ্লিষ্ট অনেক প্রতিষ্ঠানের সেবার মান, চালকদের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে দেশীয়ভাবে সরাসরি অভিযোগ দেওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। সংশ্লিষ্ট অ্যাপসের মাধ্যমে অভিযোগ করার নিয়ম থাকলেও বেশিরভাগের অভিযোগের কোন প্রতিকার করা হয়। এছাড়া উবারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইমেইল ঠিকানায় লিখিতভাবে অভিযোগ করলেও কোন উত্তর দেওয়া হয় না। শারমিন জাহান নামে এক নারী বলেন, রাইড শেয়ারিং সেবার চালকদের ব্যবহার দেখে মনে হয় গাধা-গরুদের যাত্রী বহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তারা যেমনি ভালো ব্যবহার করতে পারে না তেমিন রাস্তা-ঘাট চিনে ভালোভাবে চালাতেও পারেনা।

মিরপুরের বেসরকারি চাকুরে মাসুম বিল্লাহ বলেন, অনেক বাইকারের কাগজপত্র নেই। তারা অন্যের নামে রেজিস্ট্রেশন করা গাড়ি নিয়ে নেমে পড়েছে। এতে কখনো ট্রাফিক সার্জেন্ট গাড়ি থামামে ভোগান্তিতে পরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুন নুর বলেন, দুরত্বের চাইতে বেশি ভাড়া দেখায়। অভিযোগ দিলেও কোন প্রতিকার মেলে না। তিনি কয়েকবার বেশি ভাড়া দেওয়ার কারণে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমরান বলেন, বেশিরভাগ বাইকাররা নামকাওয়াস্তে একটি হেলমেট সরবরাহ করে। যা হাত দিয়ে চাপ দিলেই ভেঙে যাবে। তার মতে, হেলমেট দিয়ে রাইড শেয়ারিং কোম্পানির বিজ্ঞাপনের কাজ হলেও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, রাইড শেয়ারিং সেবাগুলোর বিরুদ্ধে বড় অভিযোগের মধ্যে হেলমেটের বিষয়টি একটি। তিনি বলেন, হেলমেট অবশ্যই শক্ত ও মজবুত হতে হবে। তার মতে, একটি হেলমেটের ওপর দিয়ে মোটামুটি মানের প্রাইভেটকার গেলেও যদি সেটির কিছু না হয় তবে সেটিকে মজবুত বলা যাবে।

উবারের অনিয়ম ও অভিযোগসব বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য জানতে গত বছরের ২৬ নভেম্বর উভারের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ইমেইলে লিখিতভাবে আবেদন করা হয়। যদিও এ পর্যন্ত সে সংস্থাটির পক্ষ থেকে সব অভিযোগের কোন উত্তর পাঠায়নি তারা।
ইনকিলাবের পক্ষ থেকে- কতজন চালক ও বাইকের রেজিস্ট্রেশন এবং তাদের বৈধ লাইসেন্স, মোট অভিযোগ ও প্রতিকার, সেবাগ্রহন ও প্রদানকালে যাত্রী-চালকের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের সংখ্যা এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়, উবারের আয়-ব্যয় এবং বাংলাদেশের কল্যাণমূলক কোন কাজে উবারের সহয়তাসহ ৭টি বিষয় জানতে চাওয়া হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশে উবারের মিডিয়া সংক্রান্ত বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা বেঞ্চমার্ক পিআর সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারাও অভিযোগের বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, অ্যাপসের মাধ্যমে অথবা আমাদের মাধ্যমে অভিযোগ বা তথ্য চেয়ে আবেদন করতে পারবেন। এছাড়া বিআরটিএ’র কাছে অভিযোগে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। যদিও বেশিরভাগ যাত্রী ঝামেলা এড়াতে বিষয়গুলো এখন মেনে নিয়েছে।

এদিকে, রাইড শেয়ারিং সার্ভিসকে আইনের আওতায় আনতে নীতিমালা করা হলেও এতদিনে সেটি বাস্তবায়ন করা হয়নি। অথচ দীর্ঘ আড়াই বছর শেষে নীতিমালার ১১টি শর্তের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শর্ত শিথিল করে নতুন করে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বিআরটিএ। বিআরটিএ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবির প্রেক্ষিতে বিআরটিএ নমনীয় হয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত শিথিল করতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। যদিও নীতিমালার শর্ত শিথিলের খবরে সড়ক সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞসহ যাত্রীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে বিআরটিএ পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, নীতিমালার কিছু শর্ত শিথিল করে অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছি। এজন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। শিগগিরই এ নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হবে। এ বছরের শুরুর দিকেই নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।

বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) ফারুক আহমেদ বলেন, যাত্রীর লোকেশন মনিটরিং পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ের শর্তসহ নীতিমালার ৬টি বিষয় আপাতত কার্যকর না করে নিবন্ধন দেওয়া শুরু করতে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, আপাতত কার্যকর না হওয়ার ৬টির বিষয়রে মধ্যে এসওএস সুবিধা; রাইড শেয়ারিং অ্যাপস প্রতিষ্ঠান ও বিআরটিএর ওয়েবসাইটে অভিযোগ দাখিল ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা; ভেরিফায়েড জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি; প্রতিটি রাইড পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে অবলোকন; পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে জরুরি বার্তা ও সংকেত; এবং গাইডলাইনের আওতায় অনলাইনে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওয়েব পোর্টাল স্থাপন ও ডাটাবেজ সংরক্ষণ। তবে নীতিমালার বাকি সব বিষয় এখন থেকেই কার্যকর থাকবে। এছাড়া ব্যক্তিগত মোটরযান রেজিস্ট্রেশনের পর ন্যূনতম একবছর না হলে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে দিতে না পারার শর্তটিও কার্যকর থাকবে বলে জানা গেছে। বিআরটিএ’র মতে, নিবন্ধনের আওতায় এলে রাইড শেয়ারিং সেবাগুলোর বিরুদ্ধে আসা অভিযোগে নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া গতি পাবে।

ফারুক আহমেদের মতে, নীতিমালার শর্তগুলো আসলে শিথিল নয়, কার্যকর করতে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। একইসাথে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষও নিবন্ধন কার্যক্রম চালাতে থাকব। একটা সময় পর শেয়ারিং প্রষ্ঠিাগুলোকে শর্তগুলো অবশ্যই পালন করতে হবে।

এ বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাপরিচালক মোজাম্মেল হোসেন বলে, সরকার গণপরিবহন সেক্টরের কাছে বার বার নতি শিকার করায় কখনো যাত্রীদের অধিকার বা সুবিধার বিষয়গুলো মূল্যায়িত হয়নি। যদি বিষয়গুলোর প্রতি সরকারের কঠোর নজরদারি থাকতো তাহলে কিছুটা হলেও যাত্রীদের ভরসার জায়গা থাকতো। তিনি পুরো পরিবহন সেক্টরকে একপেশে মালিকমুখী না করে যাত্রীবন্ধব করার আহবান জানান।

বিআরটিএ’র রাইড শেয়ারিং সংশ্লিষ্ট সেল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের নভেম্বরে ঢাকায় ব্যবসা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান উবার। এরও আগে, ২০১৫ সালে ‘স্যাম’ নামের একটি অ্যাপ যাত্রা শুরু করে। প্রথমে উবার, পাঠাও, সহজ, রাইডার, আকাশ টেকনোলজি, রিং টেকনোলজিসহ ১০টি অ্যাপস রেজিস্ট্রেনের জন্য আবেদন করেছিল। তবে ঢাকায় দুই-তিনটি ছাড়া অন্য অ্যাপগুলোকে সক্রিয়ভাবে রাইড শেয়ারিংয়ে দেখা যাচ্ছে না।

Leave a Reply

  • (not be published)